ঢাকা আর্ট সামিট ও সমকালীন বাংলাদেশি দৃশ্যশিল্প

সনদ বিশ্বাস

চিত্রকলা-ভাস্কর্য-নিউমিডিয়াম-পারফর্মেন্স হচ্ছে দৃশ্যশিল্পের মাধ্যম। তেমনি দৃশ্যশিল্পও সামগ্রিকভাবে নান্দনিকবোধ প্রকাশের একটা মাধ্যম। এই মাধ্যম দিয়ে আমরা রুচি ও বোধের প্রকাশ ঘটাই এবং আমরা কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব বা কোনো ব্যবস্থার গতিধারা-নিয়ম-অনিয়ম-রূপান্তর-বিবর্তন-অভিযোজন সম্পর্কে ধারণা অর্জন করতে পারি। শিল্প হচ্ছে তার বস্তুগত ও অবস্তুগত মাধ্যমের গঠনকারী উপাদানের/এককের সমাবেশের প্রতিফলন। এই সমাবেশ সময়ের সাথে চরিত্র পরিবর্তন করে। এই একক/উপাদানগুলো গঠিত হয় স্থানিক সংস্কৃতির চলমান চরিত্রের ভিত্তিতে। সংস্কৃতির প্রাথমিক পাঠে আমরা জানি, সভ্যতার সভ্য মানুষের পায়ের নখ থেকে মাথার চুল পর্যন্ত তার পোশাক-খাদ্যাভ্যাস-বিনোদন-সংস্কার সর্বোপরি সবকিছুই সংস্কৃতি। অঞ্চলভেদে স্থানিক সংস্কৃতির উপাদন ও চরিত্র ভিন্ন ভিন্ন থাকে। কিন্তু সমকালীন সংস্কৃতির গন্তব্যের চরিত্র বৈশ্বিক, যার গতিধারা কেন্দ্রাভিমুখী এবং প্রতিযোগিতামূলক। এই প্রতিযোগিতার ভিত্তিমূলে পুঁজির লড়াই এবং এ লড়াইয়ে প্রান্তিক সংস্কৃতির টিকে থাকার প্রশ্ন অগভীরভাবে ভাবলেও খুঁজে পেতে কষ্ট হয় না। স্থানিক সংস্কৃতির অভিযোজন ও তার আত্মিকরণ দুটি ভিন্ন পর্যায়। এক্ষেত্রে যা হচ্ছে তা অনেকটা প্রভাবশালী সংস্কৃতির দ্বারা দুর্বল সংস্কৃতিকে আত্মীকরণ! পোশাক ও ভাষায় যেমন এর নিঃশেষে মিশে যাওয়ার চিত্র পাওয়া যায় তেমনি শিল্পেও তার গতিধারা ও রেখা ফুটে ওঠে।

ঢাকা আর্ট সামিট একটি দ্বি-বার্ষিক শিল্পকর্ম প্রদর্শনী। ২০১০ সালে যখন প্রথম ঢাকা আর্ট সামিট শুরু হয় কর্তৃপক্ষের উদ্দেশ্য ছিল সাউথ এশিয়ার মধ্যে এ প্রদর্শনীকে কালচারাল হাব হিসাবে গড়ে তোলা। এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে চতুর্থ ঢাকা আর্ট সামিট শেষ হয়। বাংলাদেশের প্রথম দ্বি-বার্ষিক প্রদর্শনী ছিল এশীয় দ্বি-বার্ষিক চারুকলা প্রদর্শনী। তারপর জাতীয় চারুকলা প্রদর্শনী এবং নবীন শিল্পী চারুকলা প্রদর্শনী। বাংলাদেশের এই তিনটি প্রদর্শনীরই আয়োজক বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী। শিল্পকলা আয়োজিত এই দ্বি-বার্ষিক প্রদর্শনীগুলো মূলতঃ প্রতিযোগিতামূলক। বিজয়ী শিল্পীগণ টাকা ও ক্রেস্ট পেয়ে থাকেন। বাংলাদেশের আরেকটি বৃহৎ প্রদর্শনী হল ছবি মেলা। ছবিমেলা মূলত: আলোকচিত্রের প্রদর্শনী। কিন্তু সমকালীন দৃশ্যশিল্পের দুনিয়ায় যে ধরনের আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয় সেক্ষেত্রে, শিল্পকলা একাডেমীর আয়োজিত প্রদর্শনী শুধুই একপেশে ও প্রতিযোগিতার ঘেরাটোপে বন্দি। এক্ষেত্রে ছবি মেলা বা ঢাকা আর্ট সামিট অনেক বেশি আন্তর্জাতিক মানের। আশির দশকে শুরু হওয়া এশিয় চারুকলা প্রদর্শনী বিগত প্রায় ৩৫ বছর ধরে তার সমকালীন অন্যান্য আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীগুলোর তুলনায় পরিণত হয়ে উঠতে পারেনি। বলা যেতে পারে প্রতিযোগিতামূলক প্রদর্শনীও এক ধরনের বৈশিষ্ট্য। কিন্তু একটি দেশের শিল্পের পরিণতি, অগ্রগতির ভাবধারা তুলে ধরতে শুধু এ ধরনের প্রতিযোগিতা কতটুকু কার্যকারী? যদিও গত এশিয়ান আর্ট শোতে ঢাকা আর্ট সামিট ও ছবি মেলার প্রভাব কিছুটা লেগেছে! তারপরও কতটুকু গবেষণাধর্মী কর্মের উন্মেষ ও বিকাশ হচ্ছে? যে কাজগুলো পুরস্কৃত হচ্ছে এবং যারা পুরস্কৃত করছেন সমকালীন আর্টের বিচারক হিসাবে তারা কতটুকু উপযুক্ত ভেবে দেখা জরুরি। বাংলাদেশের দৃশ্যশিল্পের বিকাশ ও উন্মেষ আরো স্পষ্ট হয় যখন আমরা বই এর দোকানে গিয়ে এ বিষয়ে তেমন একটা বইপত্র বা গবেষণা খুঁজে পাই না। সমকালীন শিল্পের কথা বাদ দিলেও ১৯৪৭ থেকে ’৮০ দশক পর্যন্ত বাংলাদেশের দৃশ্যশিল্পের ধারা ও প্রবাহের উপর কতগুলো বই বা গবেষণা পাই? মৌলিক গবেষণা বাদ দিয়ে যদি অনুবাদ গ্রন্থের কথাই ধরি তার উপস্থিতিও যৎসামান্য। অথচ এদেশে শতকরা ৯৯% দৃশ্যশিল্পী বাংলামাধ্যমে অধ্যয়ন করে।

ঢাকা আর্ট সামিট একটি দ্বি-বার্ষিক শিল্পকর্ম প্রদর্শনী। সামদানী আর্ট ফাউন্ডেশন নামে একটি অলাভজনক সংগঠন এই বৃহৎ আয়োজন করে থাকে। ঢাকা আর্ট সামিটের প্রচেষ্টা অসাধারণ! কিন্তু তারা কী ধরনের কালচারাল হতে চান? তারা কি বাংলাদেশের সমকালীন শিল্পী ও শিল্পের বিকাশ নিয়ে কাজ করতে চান? নাকি সমকালীন শিল্পের শুধুই জমজমাট আসর সাজাতে চান। যদি ঢাকা আর্ট সামিটের ঢাকা শুধুই স্থানের বিবেচনায় নামবাচক হয় আর জমজমাট আসর প্রতিষ্ঠা করাই মূল উদ্দেশ্য হয়, তবে ঢাকা আর্ট সামিট দেশের বাইরেও হতে পারত! ঢাকা আর্ট সামিটের প্রমোশনাল কার্যক্রমের মধ্যে সামদনী আর্ট পুরস্কার উল্লেখযোগ্য। ৪০ বছর বয়সের কম এমন ৯/১০ জন তরুণ শিল্পীর মধ্যে ১ জনকে বাছাই করে এ পুরস্কার দেওয়া হয়। নির্বাচক ও পুরস্কার নির্ণয়ক শিল্পী ও তাত্ত্বিকগণ সবাই দেশের বাইরের। ঢাকা আর্ট সামিটের আরেকটি পর্যায় হল বাংলাদেশের লোকাল গ্যালারি ও আর্টিস্টদের লিড ইনিসিয়েটিভগুলোর জন্য স্পেস বরাদ্দ দেওয়া এবং তাদের কর্তা ব্যক্তিদের বিদেশে বড় বড় প্রদর্শনীতে ঘুরতে নিয়ে যাওয়া। ২০১৮ ঢাকা আর্ট সামিটের বাংলাদেশ প্যাভিলিয়ানের কিউরেটর হিসাবে ছিলেন গ্যালারি চিত্রকের পরিচালক ও সাবেক পরিচালক, চিত্রশালা, শিল্পকলা একাডেমী। তিনি ৯৫% পেইন্টিং ও ৫% ত্রিমাত্রিক কাজ নিয়ে প্রকৃত অর্থেই বাংলাদেশের ফাইন আর্ট ডমিনেটিং ক্যারেক্টারকে স্পষ্ট করে তোলেন। এই প্রদর্শনীতে নিউ মিডিয়া-পারফর্মেন্স-ইন্সটলেশনের উপস্থিতি খুঁজে পাওয়া যায় না। মজার বিষয় বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক পারফর্মেন্স বিয়েনাল অনুষ্ঠিত হয় এবং এখানে সমকালীন শিল্পীদের প্রায় ২০ জনের ওপর প্রতিষ্ঠিত পারফর্মেন্স আর্টিস্ট রয়েছে। গত এশিয়ান আর্ট বিয়েনালে ৭ জন বাংলাদেশি আর্টিস্ট পুরস্কৃত হয়েছে তার মধ্যে প্রত্যেকেই নিউ মিডিয়া নিয়ে কাজ করেছেন। তবে এত বৈচিত্র্য থাকতে কিউরেটর কেনো শুধু পেইন্টিং ও দু’একটি ভাস্কর্য দিয়ে তার কিউরেটিং শো সাজালেন? প্রকৃত সমকালীন বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি নিঃসন্দেহে এমনটি নয়! বাস্তবতা এই যে বাংলাদেশের সমকালীন শিল্পকে রিপ্রেজেন্ট করতে হলে নিউমিডিয়া আর্টিস্টদের বিশেষভাবে ফোকাস করতে হবে, কারণ ’৮০ এর দশক থেকে তারা সক্রিয়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে। ঢাকা আর্ট সামিটের সাথে বিশ্বের বিভিন্ন আর্ট গ্যালারি ও মিউজিয়ামগুলোর সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। ঢাকা আর্ট সামিটের কিউরেটর একজন আমেরিকান। নাম ডায়ানা ক্যাম্পবেল। ডায়ানা দিল্লি বেইজ কিউরেটর এবং সাউথ এশিয়ান আর্টের উপর তার গবেষণা রয়েছে। ঢাকা আর্ট সামিটের ভেন্যু পার্টনার বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর চিত্রশালার বিশাল গ্যালারিকে মাথায় রেখে ঢাকা আর্ট সামিটের ডিজাইন করা হয়। ডিজাইনের বৈশিষ্ট্য ছিল বাংলাদেশ ও সাউথ এশিয়ার মাস্টার আর্টিস্ট ও আর্টিটেক্টদের নোটেবল কাজ। ইউরোপিয়ান বা আমেরিকান কিউরেটরদের কিউরেশনে বিশেষ ইস্যু ও ফিলোসফিক্যাল চিন্তাকে উপজীব্য করে কয়েকটি দলীয় ও ব্যক্তিক শো’র পরিকল্পনা। এসকল শিল্পীরা অধিকাংশই প্রবাসী ইণ্ডিয়ান ও পাকিস্তানি যারা ইউরোপ ও আমেরিকায় নাম কামিয়েছেন। এক্ষেত্রে দু’একজন বাংলাদেশি এবং এশিয়া প্যাসিফিকের দু’একজন শিল্পীকেও দেখতে পাওয়া যায়। কয়েকটি কিউরেটেড শো রিসার্স বেইজ। লিজেন্ডারি আর্টিস্টদের দু’একটি কাজ। কয়েকটি সেমিনার। এসকল সেমিনারে বক্তারা থাকেন বিদেশি মিউজিয়ামের কিউরেটর, বিশিষ্ট ইন্ডিয়ান ও পাকিস্তানি শিল্পীগণ।

ঢাকা আর্ট সামিট পরিপাটি-সিকিউর-চকচকে কর্পোরাল পরিবেশনা। সামিটকে কেন্দ্র করে ফুড কোর্ট–গানের মঞ্চ অন্যান্য সাপোর্টিং অনুষ্ঠানগুলো সব মিলিয়ে জমজমার্ট জন সমাগম ঘটে। শিল্পকলায় অন্যান্য শোগুলোতে তেমন লোক না হলেও ঢাকা আর্ট সামিটে লোক সমাগমের কোনো কমতি নেই। ইস্কুলের বাচ্চা থেকে শুরু করে বিভিন্ন পেশার লোকেরা অন্তত সেলফোনে সেলফি তুলতে আসলে আর্ট এর বিকাশ প্রান্তিক লেভেল পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে বলে ধরে নিতেই পারি। কারণ, বাংলাদেশের শিক্ষিত, অর্ধ-শিক্ষিত, উচ্চ শিক্ষিত অনেকেই মনে করে ছবি আঁকার সঙ্গে ধর্মের বিরোধ রয়েছে। এমন একটা বিতর্ককে উপেক্ষা করে এত লোকের সমাগম ভিজ্যুয়াল আর্টের প্রসারে নিঃসন্দেহে প্রসংশনীয়। তবে এখানে আমরা বাংলাদেশের চোখে বাংলাদেশকে দেখতে পাই কিনা সে তর্ক-যুক্তি ধোয়ার মত বায়বীয় থাকে! মূলত সচেতন দৃষ্টিভঙ্গিতে পর্যবেক্ষণ করলে পজিটিভ ও নেগেটিভ দুটি চিত্রই দেখতে পাই আমরা। বাংলাদেশের শিল্প ও শিল্পীরা যে নব্য-ঔপনিবেশিক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাত্রা করেছিল ঢাকা আর্ট সামিট সেখানে যেন নতুন কাঠামোতে নতুন যাত্রা যোগ করল।

https://weeklyekota.net/?page=details&serial=6448&fbclid=IwAR2OZxV8Yu9oqRIqnsCh3y22MSz7mc2cLW9IIUPZeqzUx7PRnG5fRfR5NEo